সুমন্ত্রর জার্নাল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়

মূর্তি ভাঙার ফুর্তি

গড়ের মাঠে দাঁড়িয়ে আছে মূর্তিগুল কবন্ধ

তাই না দেখে লিখতে বসি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ

রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগর সবাই এখন কনিষ্ক

কী লিখতে কী লিখলাম বড়ই ‘অন্যমনিষ্ক’

না এই অসাধারণ ছড়াটি আমার লেখা নয়, এমন ক্ষমতা আমার কোনদিন ছিল না, বা হবেও না। এটি লিখেছিলেন শ্রী অমিতাভ চৌধুরী তাঁর ‘ইকড়ি মিকড়ি’ বই-এ। এখন সে বই পাওয়া যায় কিনা জানি না। মনে হয় ষাট সত্তরের দশকে নকশালদের মূর্তি ভাঙা দেখেই লিখেছিলেন এই ছড়া। (এখন চারদিকে যেভাবে লোকে মুড়ি মিছরির মত পি এইচ ডি করে ফেলে কেউ হয়ত কোনদিন কনিষ্কের মূর্তি নিয়ে ‘পৃথিবীর প্রথম রাজনৈতিক মূর্তি ভাঙা’ গোছের থিসিস লিখে ডক্টরেট পেয়ে যাবেন।)

বলা হয়ে থাকে কোন ঘটনার রিএ্যকশনে কোন শিল্প সৃষ্টি হলে তা নাকি ক্লাসিক বা কালজয়ী হয় না। উৎপল দত্ত তাঁর ‘ব্যারিকেড’ নাটকে সাংবাদিকদের বেশ এক হাত নিয়েছিলেন। সে নাটক যখন আবার ওনারা করলেন উৎপল বাবুর মৃত্যুর পর তখন সে নাটক দেখে রেগে-মেগে এক সাংবাদিক ভদ্রলোক এরকম একটা মন্তব্য করেছিলেন। সে মন্তব্য যে কতটা ভুল তা অমিতাভ বাবুর ছড়াই প্রমাণ করছে। সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা প্রতি-ঘটনার প্রেক্ষিতে দেখা যাচ্ছে ১৯৭০ সালের ঘটনা নিয়ে লেখা ছড়াও কতটা কালজয়ী!

মূর্তি বা কোন প্রতিরূপের মধ্যে একটা larger than life ব্যাপার থাকে আর তাই সেটাকে ভাঙতে পারলে অপমানটাও বেশ জোরদার হয়। ত্রিপুরাতে লেনিনের মূর্তি বুল্ডোজার দিয়ে ভাঙাকে সমর্থন করতে গিয়ে এক ভি আই পি বি জে পি সমর্থক বলে বসলেন ইউক্রেন রাশিয়া কাজাখে জার্মানিতে তো শত শত লেনিনের মূর্তি ভাঙা হয়েছে। সামান্য একটা মূর্তি ভাঙা হতেই পারে, শাসক যেমন কারো মূর্তি বসাতে পারে অন্য শাসক সে মূর্তি সরাতেই পারে। বড় উত্তম যুক্তি সন্দেহ নেই। আইনের বইয়ে কী লেখা আছে জানি না, কিন্তু এরকম কথা লেখা থাকলে আশ্চর্য হব না। আইন প্রণেতাদের আর যাই গুণ থাকুক না কেন সেন্সিটিভিটি-র তোয়াক্কা তাঁরা যে করেন না এ কথা সবাই জানে। তাও বলব যে ভি আই পি এ এ কথা বললেন তিনি সচেতন ভাবে এ তথ্য অগ্রাহ্য করলেন যে সেখানে কোন সরকার এ কাজ করে নি কারণ সেখানে তখনো পুরনো সেই সরকার যাঁরা মূর্তি বসিয়েছিলেন। এ কাজ নাকি ‘জনরোষের’ প্রকাশ।

এটা আপাত মজাদার কিন্তু আসলে ভয়ঙ্কর কথা মানে এই ‘জনরোষ’। মহম্মদ আখলাখকে পিটিয়ে মেরেছে এই ‘জনরোষ’, বহু যায়গায় গরু নিয়ে যাওয়ার সময় নিগৃহীত হয়েছেন অনেকে, কোন রাজনৈতিক দল এ কাজ করে নি, করেছে ‘জনরোষ’, ঠিক যেমন নাজি জার্মানিতে বহু ইহুদী হয়েছেন ‘জনরোষের’ শিকার, বা গুজরাটে দাঙ্গাও কোন রাজনৈতিক দলের প্রোগ্রাম ছিল না, সেসবের কারণ ‘জনরোষ’। ভয় হয় জার্মানিতে যেমন পরবর্তীকালে এইসব ‘জনরোষের’ ঘটনা সরকারের কর্মসূচি হয়ে গেল এখানে সেরকম হবে না তো?

যাই হোক প্রসঙ্গে ফিরি। মূর্তি ভাঙার একটা কারণ দেখানো হয় এই জনরোষ কিন্তু সেটাই সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। মার্কিন বাহিনী যখন ইরাক আগ্রাসন করে ইরাকের দখল নিল সেখানে সাদ্দাম হুসেনের অনেক মূর্তি ভাঙা হয়েছে। তা করেছে উর্দি পরা সৈনিকের দল, সেদেশের বা অন্য কোন দেশের সাধারণ মানুষ তা করেন নি, কাজেই জনরোষের তত্ত্ব খাটল না। আসলে নতুন শাসকদের সব সময় একটা প্রবণতা থাকে ইতিহাসকে মুছে ফেলার। তার ফলে মাঝে মাঝে খুব হাস্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। আবার কখনো তার ফলে যা দাঁড়ায় তা বেশ বেদনাদায়কও বটে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কোন এক গেটের সামনে ঋষি অরবিন্দের একটি মূর্তি আছে। এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু মুশকিল হল অন্য যায়গায়। সেখানে আগে ছিল পরাধীন ভারতের ভাইসরয় কার্জনের মূর্তি। বসানো হয়েছিল ৮ এপ্রিল ১৯১৩। ভারত স্বাধীন হবার পর দেশের সরকার সেখান থেকে কার্জনকে সরিয়ে বসিয়ে দিলেন শ্রী অরবিন্দকে। একটু ভুল হল, বসিয়ে নয় দাঁড় করিয়ে দিলেন। কার্জনের মূর্তিটি লন্ডনের গ্ল্যাডস্টোন মনুমেন্টের আদলে করা। সেখানে মাঝখানে দাঁড়িয়ে গ্ল্যাডস্টোন আর চারদিকে আরও কতগুলি নারী ও শিশুর ফিগার। সেইমত কার্জনের পাশেও ছিল কয়েকটি নারী ও শিশু। কার্জন সরলেন, অরবিন্দ এলেন কিন্তু সেই নারী মূর্তিগুলি যেমন ছিল তেমন রয়ে গেল।

আমার পাপী মনকে পাঠক ক্ষমা করবেন, কাউকে অশ্রদ্ধা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমার নেই, কিন্তু ওখান দিয়ে যাবার সময়ে যতবার ওই মূর্তি দেখি আমার মনে হয় ঋষি অরবিন্দ যেন অতগুলি বিদেশী নারী পরিবৃত হয়ে নিতান্ত জড়সড়ও হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের এত বড় শহরে কী এই মনীষীর মূর্তির জন্য আর কোন ভাল যায়গা পাওয়া গেল না? আর কার্জনকে সরিয়ে দেয়া হল যে যুক্তিতে সে যুক্তিতে তো ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলটাই ভেঙে ফেলা উচিত ছিল। এ কেমন বিচার? রাজতন্ত্রের সামান্য ভৃত্য হবার অপরাধে কার্জনকে নিয়ে গিয়ে ফেলে রাখা হল তাঁর ব্যারাকপুরের বাড়ীতে আর সেই রাজতন্ত্রের সব থেকে বড় প্রতীক মহারানী ভিক্টোরিয়া দিব্যি তাঁর ঘর বাড়ী নিয়ে বসে থাকলেন!

১৮২৮ সালে কলকাতায় নির্মিত হয় অক্টারলোনি মনুমেন্ট। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মেজর জেনারেল স্যার ডেভিড অক্টারলোনি ১৮০৪ সালে মারাঠা ও গোর্খা দমন করেছিলেন। তিনি মারা যান ১৮২৫-এ। তাঁর স্মৃতিতেই এই মনুমেন্ট। নিঃসন্দেহে এ মনুমেন্ট ভারতবাসীর কাছে গৌরবের নয়। কিন্তু যে জাতি প্রায় দুশো বছর পরাধীন থেকেছে তার রাজধানীর (১৭৭২-১৯১১) বুকে অনেক অপমানের স্মৃতি যে থাকবে তা তো স্বাভাবিক। সব তো মুছে ফেলা যাবে না, আর সে চেষ্টাই একেবারে নিরর্থক। কিন্তু আমরা যা করে বসলাম তা মুছে ফেলার চেষ্টার থেকেও মারাত্মক। ১৯৬৯ সালের ৯ই আগস্ট আমরা সেই মনুমেন্টের নাম দিয়ে বসলাম ‘শহীদ মিনার’। স্বাধীনতা সংগ্রামে নিহত মানুষদের প্রতি এ নাকি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। হায় রে! ওই মনুমেন্টের এক তৃতীয়াংশ মাপেরও একটি স্মারক তৈরি করে সেটিকে ওই নাম দিলে আমার মনে হয় সেটা অনেক বেশী ঠিক কাজ হত।

কার্জনের মূর্তি সরাবার কথা আগেই বলেছি। স্বাধীনতার আগেও ভারতীয়দের উদ্যোগে মূর্তি না হলেও স্মারক সরাবার ঘটনা ঘটেছে। সিরাজ যখন ফোর্ট উইলিয়াম আক্রমণ করেন তখন এক বদ্ধ কুঠুরিতে আটকে পড়ে বেশ কিছু ব্রিটিশ পুরুষ মহিলা শিশু মারা যান বলে কথিত আছে। লালদিঘীর কোণে একটি স্মারক নির্মিত হয়েছিল এঁদের স্মৃতিতে। তার নাম হলওয়েল মনুমেন্ট। জন জেফানিয়া হলওয়েল ওই ঘরে বন্দী থেকেও বেঁচে গিয়েছিলেন এবং মূলত তার বর্ণনা অনুযায়ী এই ঘটনার ‘ইতিহাস’ লেখা হয়েছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে প্রবল দাবী ওঠে এই মনুমেন্টকে ওখান থেকে সরাতে হবে কারণ এটি আমাদের দেশের মানুষের পক্ষে অপমানজনক। সেই দাবী অনুযায়ী সে মনুমেন্ট সরানো হয় ১৯৪০ সালে ও পুনঃ-প্রতিষ্ঠা করা হয় ডালহৌসি চত্বরে অবস্থিত সেন্ট জনস চার্চের লাগোয়া যে গোরস্থান আছে তার এক কোনে।

মূল প্রশ্নটা শুধু মূর্তি ভাঙা নয়, জনরোষের দোহাই তো নয়ই। আগে ঠিক করা দরকার শাসক পরিবর্তন হলে আগের শাসকের সব স্মৃতিকে মুখে ফেলার চেষ্টাটা কতটা যুক্তি সঙ্গত। ত্রিপুরার ব্যাপারে পাব্লিক সেন্টিমেন্ট বা জনরোষের কথাটা ধোপে টেকেই না। আমাদের তথাকথিত গণতন্ত্রের অঙ্ক বড় অদ্ভুত। বিজয়ী ও বিজিত দলের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান মাত্র পাঁচ বা ছয় শতাংশ। তার সহজ অর্থ প্রায় অর্ধেক মানুষ সে মূর্তির অপসারণ চাইতে পারেনই না। পাব্লিক সেন্টিমেন্ট কী অর্ধেক মানুষকে বাদ দিয়ে হতে পারে? আসলে কী লেনিন কী সাদ্দাম কী বামিয়ানের বুদ্ধ, জনরোষ কিছুই ভাঙে নি, ভেঙেছে ঘোষিত বা কার্যত শাসক।

আর রাশিয়া বা পূর্ব ইউরোপের কথাও যদি বলি সেখানেও কী একাজ করা ঠিক হয়েছে? একথা কি বলা যায় যে সেদেশের আপামর জনসাধারণ লেনিনের মূর্তির অপসারণ চেয়েছিলেন? উলফগঙ বেকারের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘গুড বাই লেনিনে’ আমরা দেখি মনে প্রাণে কমিউনিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী এক অসুস্থ বৃদ্ধাকে জানানোই যায় নি যে পূর্ব জার্মানি আর নেই, দুই জার্মানি এক হয়ে গিয়েছে। তিনি সেই ধাক্কা নিতে পারবেন না বলে ভেবেছে তাঁর ছেলে মেয়েরা। একদিন সবার অসাবধানে তিনি খোলা রাস্তায় বেড়িয়ে এসেছেন আর এসে দেখছেন লেনিনের এক বিশাল মূর্তিকে ভেঙে হেলিকপ্টারে ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হতচকিত বৃদ্ধা হাত বাড়িয়ে দেন লেনিনের প্রসারিত হাতের দিকে যেন ছুঁতে চান তাঁর নেতাকে। এরকম অনেক মানুষকে দেখেছেন বলেই তো চরিত্রটা সৃষ্টি করেছেন পরিচালক। হয়ত বেশী সংখ্যক মানুষ এতে খুশী হয়েছিলেন কিন্তু বেশী মানেই তাদের ইচ্ছার মর্যাদা আছে আর সংখ্যায় কম হলে তাদের রুচি পছন্দকে ঠেলে ফেলে দেয়া যায় এটা তো কোন সভ্য সমাজের রীতি হতে পারে না। আমি একটি প্রাক সোভিয়েত দেশে দীর্ঘদিন কাটিয়েছি কর্মসূত্রে। আমি দেখেছি সেখানে ষাটোর্ধ মানুষেরা কিন্তু পুরনো কমিউনিস্ট ব্যবস্থারই সমর্থক।

প্রকৃত জনরোষে কিছু ভাঙা ভাঙির দরকার পড়ে না। কিছু না ভেঙেই চূড়ান্ত অপমানের ব্যবস্থা করে মানুষ। বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের বাড়ী এখনও আছে মুর্শিদাবাদে। কেউ তা ভেঙে ফেলে নি। শুধু মানুষ সে বাড়ীর তোরণের নাম দিয়েছে ‘নিমক হারাম দেউড়ি’।

পড়ে ভালো লাগল? খবরটি কেমন লাগল আমাদের জানান banglabuzz1234@gmail.com এ। আপনার আশেপাশের জানা-অজানা খবর শেয়ার করুন banglabuzz1234@gmail.com এ।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করার জন্য পাশের লিঙ্ককে ক্লিক করুন Facebook

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Comments: 0

Your email address will not be published. Required fields are marked with *